মধুসূদন দত্তের 'শকুন্তলা': পৌরাণিক বেষ্টনীতে আত্মসচেতন এক নারী
পুরাণে এমন কিছু নারী চরিত্র আছে যাঁদের রূপ লাবণ্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁদেরকে লাভ করার বাসনা নিয়ে তাঁদের দাবি পূরণ করবেন বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন সমৃদ্ধশালী রাজারা। সৌন্দর্যের মোহে পড়ে বিবাহ পূর্বে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেও পরবর্তীকালে বাস্তবের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে তাঁরা সে কথা মনে রাখেননি। যেমন রামায়ণে রাজা দশরথ বিবাহ পূর্বে কেকয়ীকে কথা দেন যে তাঁর পুত্রকে রাজা করবেন, কিন্তু পরে সেই দাবী তাঁকে কিভাবে আদায় করতে হয় তা আমরা সবাই জানি। শকুন্তলাও সেইরূপ একজন নারী, রাজা দুষ্মন্ত কথা দিয়েছিলেন তাঁরই পুত্র ভবিষ্যতের রাজা হবেন এবং ঋষিকন্যা পাবেন রাজমহিষীর সম্মান। কিন্তু রাজা দীর্ঘ অপেক্ষার পরও ফিরে আসেননি। শকুন্তলা তাঁর অধিকার ফিরিয়ে নিতে পেরেছে এক দীর্ঘ লড়ায়ের মধ্য দিয়ে, যা খুব যে সহজ ছিল তা নয়। তাঁর অধিকার আদায়ের পূর্ব মুহূর্তের কাহিনিকে অবলম্বন করে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত 'দুষ্মন্তের প্রতি শকুন্তলা' রচনা করেছেন, যা তাঁর "বীরাঙ্গনা" পত্রকাব্যের অন্তর্গত। যেখানে শকুন্তলাকে আরও বেশি আত্মসচেতন ও আধুনিক করে দেখালেন মধুসূদন দত্ত।
অপূর্ব দক্ষতায় সেখানে শকুন্তলাকে তিনি দেখালেন অতি আধুনিকা নারীরূপে। যিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জীবনের আশা ছাড়েন না, ইতিবাচকতার পথে চলতে এবং তা স্বীকার করতেও দ্বিধা বোধ করেন না, জীবনের আশা সহজে ত্যাগ করেন না। যিনি স্বামীকে তাঁর পরিস্থিতির কথা সুন্দরভাবে গুছিয়ে বলতে সক্ষম। নিজে সরাসরি পতি নিন্দা না করলেও লোকে যে তাঁর স্বামী সম্পর্কে খারাপ সিছে সমাজ যে তাঁর স্বামী সম্পর্কে খারাপ বলছে তাও সুকৌশলে স্বামীকে বুঝিয়ে দেন তিনি। এই বুদ্ধিমত্তা শকুন্তলাকে এক অন্যরকম তাৎপর্যে মন্ডিত করে। যদিও তিনি পত্রে নিজেকে দাসী, পদযুগলের সেবিকা ইত্যাদি বলে অভিহিত করেছেন তবু তার পত্রে এক অপূর্ব ব্যক্তিত্বের প্রকাশ আমরা লক্ষ্য করি।